এক একটা গানের গায়ে এক একটা নাম লেখা থাকে। সময় লেখা থাকে। শৈশব, কৈশোর, যৌবন লেখা থাকে। এক একটা গান যেন টাইম মেশিনের এক একটা চাকা। ওদের গায়ে ভ্যাপসা গন্ধ হয় না। পোকায় কাটে না। ভাঁজ পড়ে না অবাঞ্ছিত।
মাখনের মতো হেমন্তের গলায় 'কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো রূপকথা নয় সে নয়...' শুনলেই আজও সেই লাল মেঝে, কালো বাক্সের মতো ন্যাশনাল প্যানাসনিক টেপ রেকর্ডার, কালো কাঠের আলনা, কড়িকাঠ, কুলুঙ্গি এসব মনে পড়ে যায়। টেপ জড়িয়ে গেলে আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছাড়ানো মনে পড়ে, লোডশেডিং হলে রকে বসে বাবার গলার 'রানার ছুটেছে খবরের বোঝা হাতে রানার রানার চলেছে রানার' মনে পড়ে। অন্ধকার পাইনের বনের ধারে দাঁড়িয়ে বলা "বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা টা একবার গাও না প্লিজ" মনে পড়ে। স্থায়ী অন্তরা গুলিয়ে যাওয়া মনে পড়ে। 'আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে'র পরে মুছে নেওয়া চোখ, তাও। সাদাকালো নয়, টেকনিকালারে সরে সরে যায় গানের ছবি।
'এই পথ যদি না শেষ হয়' শুনলে উত্তম-সুচিত্রা মনে পড়ে না আমার। মনে পড়ে গঙ্গার ওপর লঞ্চের পিকনিক। বাবার এক হাতে মাইক, অন্য হাত মায়ের কাঁধে, দরাজ গলায় 'এই পথ যদি না শেষ হয়' আর মাইকের কাছে মুখ এনে মায়ের 'তুমি বলো'। ঝলমলে উজ্জ্বল সব মুখ মনে পড়ে, হাততালির শব্দ মনে পড়ে, মায়ের লজ্জা, গর্ব, আহ্লাদ মেশানো হাসি, কাগজের প্লেটে ফিশ ফ্রাই, শেষ না হওয়া সেকেন্ড হুগলী ব্রিজ, শীতের নিরীহ গঙ্গা - দৃশ্যগুলো জলের মতোই আঙুল গলে পালায়।
বড় হয়ে যাই। ডানায় রঙ লাগে। চন্দ্রবিন্দু শিখি। বাবাকে বলি "একটা গান শুনবে?" রাজি হয়। নতুন পাওয়া ফিলিপস এর সিডি প্লেয়ার বলে 'বেখেয়ালে খুঁজে পাওয়া বই, ভালো আর থাকতে দিচ্ছে কই'। উত্তেজনা একটুও না লুকিয়ে বলি, "ভালো না?"
বেখেয়ালে গানগুলো ফিরে ফিরে আসে। টেনে আনে গল্পের ছবি। তেলা চুলে বেড়া বিনুনি বাঁধে লাল নিল ফিতেয়। একা হয়ে হেডফোন গুঁজি কানের ফুটোয়। জর্জ বিশ্বাস আজও সেই আগের মতোই গান - যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি, ঝড় এসেছে ওরে ওরে....দম চেপে ডুব দিই সুরে।
No comments:
Post a Comment