আজকে সেই
প্রাক-ধনতেরাস যুগের কথা বলব, যখন বাঙালী কালীপূজো বলতে শুধু বাজি পোড়ানোই জানত।
বাজির জমকও ছিল কম। ফুলঝুরি, রংমশাল, তুবড়ি, চরকি, হাউই, ছুঁচো বাজি, দোদোমা
কালিপটকা, সাপবাজিই ছিল সম্বল। সোনার গয়না, রুপোর টাকা, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ইত্যাদির
কোনও ভূমিকা ছিল না।
কালীপুজোর আগের
কটা দিন মহা ব্যস্ততায় কাটত। বাবার সুপারভিশানে ছাদে খবরের কাগজ পেতে লাইন দিয়ে
রোদে দেওয়া হত গোটা কুড়ি রংমশাল, পাঁচ-ছ প্যাকেট ফুলঝুরি, গোটা দশেক চরকি, তার
বাজি, সাপবাজি, ব্যস। আর একটু বড় হতে তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল কালিপটকা আর বুড়িমার চকোলেট
বোম। তবে কিনা বাজি রোদে দেওয়া তো আর সহজ কাজ নয়! রোদে দিয়ে রেগুলার ইন্টারভ্যালে
সেগুলোকে উল্টে পাল্টে দিয়ে আসতে হবে। আর সেই সুযোগে বারবার বাজিগুলো হাতে
নাড়াচাড়া করা যাবে আর মিলিয়ে নেওয়া যাবে স্টক। এই স্টক মেলানোর ব্যাপারটা অত্যন্ত
জরুরি, কারণ বাজি পোড়ানোর সময় কেউ এক্সট্রা বাজি ফাটিয়ে ফেললো কিনা, সেদিকে কড়া নজর
রাখা দরকার। আর সেই জন্যেই স্টক মুখস্থ করা।
বাড়ির দোতলার
বারান্দার বেশ খানিকটা অংশে তখন ছোটদের প্রবেশ নিষেধ, কারণ সেখানে আমাদের
জ্যাঠতুতো দাদার কর্মযজ্ঞ চলছে। লোহাচুর, অ্যালুমিনিয়াম গুঁড়ো, গন্ধক, তুবড়ির খোল,
রংমশালের খোল সার দিয়ে রাখা। রান্নাঘর থেকে শিলনোড়া হাইজ্যাক করায় একচোট হুলুস্থুল
সকালে হয়ে গেছে। জিরে, আদা, রসূনের বদলে এখন তাতে গন্ধক বাটার কাজ চলছে। কাজ মিটে
গেলে শিলনোড়া যারা ব্যবহার করে তাদের মধ্যেই একজনকে দায়িত্ব নিয়ে ওটা পরিস্কার করে
পুরনো জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নাওয়া খাওয়া ভুলে তখন দাদার ওয়ার্কশপ চলছে। তুবড়ির
উচ্চতাই পাড়ার মাঠে প্রেস্টিজ নির্ধারক মাপকাঠি। সবমিলিয়ে বাড়ির বাতাসে তখন
বারুদের তুমুল গন্ধ।
কালীপুজোর আগের দিন অর্থাৎ ভূত চতুর্দশীর দিন সকালে চোদ্দ শাক খাওয়া আর রাতে
চোদ্দ প্রদীপ জ্বালা ছিল রুটিন। একটা থালায় চোদ্দটা ছোট ছোট মাটির প্রদীপ সর্ষের
তেল, সলতে দিয়ে জ্বেলে বাড়ির বিভিন্ন কোণে বসিয়ে দিত মা বা কাকিমা, ভূত তাড়াতে। পরে
বড় হয়ে অবশ্য মনে হয়েছে যে ও নেহাতই অর্থহীন একটা নিয়ম। যে বাড়িতে কাক চিল পড়ার অবস্থা
ছিল না, সে বাড়িতে ভূত আসবে কোন সাহসে?
কালীপূজোর দিন সন্ধ্যেয় আসল পরীক্ষা। এক নম্বর পরীক্ষা মোমবাতি জ্বালিয়ে
রাখা। বারান্দার আলসেয় সরু সরু মোমবাতির পেছনে আগুন দিয়ে বসানো তো হল। কিন্তু
লাইনের শেষে পৌঁছতে না পৌঁছতেই শুরুর মোমবাতি নিবে যায়। আবার সেগুলো জ্বালাতে গেলে
বাকিগুলো গন। শেষে হাল এবং কণ্ঠ দুইই ছেড়ে বাজি পোড়ানোয় মনোনিবেশ এবং যবনিকা পতন।
এখনকার কালিপুজো-গুলোর জাঁক অনেক বেশি। 'মেড ইন চায়নার' আলোয় ছাদ-বারান্দা ঝলমলায়। অনেকরকমের বাজি আসে। আকাশে সাঁই করে
উঠে গিয়ে মস্ত বড় ফুল হয়ে ঝরে পড়ে পাঁচশো টাকার নোট। প্যারাশ্যুট নামে, আলোর মালা ভাসে
আকাশে। কিন্তু আর যাই হোক দোকানের কেনা তুবড়ি দাদার তুবড়িকে টেক্কা দিতে পারে না
আজও। ফুস করে জ্বলে উঠে নিবে যায়।
আর কেন জানিনা, ভাইবোনেরা সেই ছোটবেলার ফুলঝুরি চরকির গল্পেই ঘুরেফিরে চলে
আসি বারবার। দাদার হাতে রংমশাল ফেটে যাওয়ার গল্পে, কাকার পেছনে চরকি তাড়া করার
গল্পে, দাঁত পড়ে রসগোল্লায় গেঁথে যাওয়ার গল্পে। বারুদের গন্ধমাখা লালনীল আলোয়
বোধহয় মাদকতা আছে।
পুনশ্চঃ তখন বারুদের
গন্ধ বললে বাজি পোড়ানোর কথাই মাথায় আসত।
বড্ড ভালো লিখছেন আপনি।
ReplyDelete