বাবার হাতটা খুব বড় ছিল। পুরো হাতটা ধরতে পারতাম না বলে, রাস্তায় বেরোবার সময় বাবা বাঁ হাতের তর্জনীটা বাড়িয়ে দিত। আর আমি সর্বশক্তি দিয়ে আমার ডান হাতের মুঠোয় চেপে ধরে রাখতাম ঐ একটা আঙুল। বাদামী রঙের, চওড়া, একটু খসখসে একটা আঙুল। পাড়ার গলিতে, পুরির সমুদ্রের ধারে, লীডার নদীর পাড় ধরে হেঁটে যাবার সময়, স্কুল বাসে ওঠার ঠিক আগের মুহুর্ত পর্যন্ত ঐ একটা আঙুল ধরেই সবচেয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করেছি। মাইলের পর মাইল বছরের পর বছর। বাবা হাত ভাঁজ করলে বাইসেপ টা ফুলে উঠত। আর আমরা তখন বাবার হাতটা টিপে টিপে দেখতাম। লোহার মত শক্ত লাগত। ওয়েট লিফটিং করত তো, তাই গায়ে জোর ছিল ঢের। বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি দেদার। অত উঁচু থেকে সবকিছু খুব নিচু লাগত। ভয়ও করত। বাবার মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরে থাকতাম। রামেস্বরমের মন্দিরের লাইনে দাঁড়িয়ে আমাকে তুলে উঁচু করে ধরেছিল যাতে বিগ্রহটা দেখতে পাই। দূরপাল্লার ট্রেনের ওপরের বার্থে উঠতে চাইলে এক ঝটকায় তুলে ওপরে বসিয়ে দিত। এক হাতে হোল্ডল, অন্য হাতে সুটকেস নিয়ে বাবা সবার আগে আর আমরা পেছনে পেছনে ছুটতাম ট্রেন ধরার সময়। লোকাল ট্রেনেও নাগালের বাইরের ঐ হ্যান্ডরেলেগুলো ছোঁবার আগ্রহ ছিল অসীম। ট্রেন ফাঁকা হয়ে এলেই তাই বাবার হাতে টান মেরে আঙুল দিয়ে ইশারায় টুক করে ইচ্ছেটা বুঝিয়ে দিতাম। আমাদের ষ্টেশন আসার আগেই ইচ্ছাপূরণ। তখন আর বড়দের সঙ্গে আমার কোনো ফারাক নেই। সবার মতো আমিও হ্যন্ডরেলে ভর। আর যেকোনো উঁচু জায়গা দেখলেই সেখানে উঠতে চাইতাম আর তারপরেই ওয়ান, টু, থ্রি...বলে ঝাঁপ; আর প্রত্যেকবার একইরকম তৎপরতায় বাবা খপ করে লুফে নিতেই বায়না - "আর একবার।"
এখন বাবার হাতটা খুব সরু হয়ে গেছে। আমার চেয়ে সরু। ইনজেকশন দিতে এসে কম্পাউন্ডার মাংস খুঁজে পায় না। এখন আমি গোটা হাতটাই ধরতে পারি অনায়াসে। নিজেরটা বাড়িয়ে দিই, যাতে সহজে উঠতে পারে বিছানা থেকে। এখনও শুয়ে থাকতে থাকতে নিজের হাতটা দ্যাখে বাবা মাঝে মাঝে। একদিন বললো "মাঝে মাঝে চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছে করে। আমারই হাত তো?"
No comments:
Post a Comment