অতএব সুকুমার সমগ্র পড়ে শোনানোর দায়িত্ব বাবার চওড়া কাঁধেই বর্তায়। সেবার পুজোয় যখন তিন ভাইবোন (আমি, ভাইয়া, দিদিয়া) একত্র হয়েছি আর তিনজনকে দুপুরে ঘুম পাড়ানোই সবচেয়ে দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাবা মাঠে নামলো, হাতে সুকুমার সমগ্র। ভারী গলায় পড়তে শুরু করল -
"বেজায় গরম। গাছতলায় দিব্যি ছায়ার মধ্যে চুপচাপ শুয়ে আছি, তবু ঘেমে অস্থির। ঘাসের উপর রুমালটা ছিল, ঘাম মুছবার জন্যে যেই সেটা তুলতে গিয়েছি অমনি রুমালটা বলল "ম্যাও!" কি আপদ রুমালটা ম্যাও করে কেন?"
ব্যাস। তারপর থেকে দুপুরে বিছানায় যাওয়া নিয়ে কোনো বিদ্রোহ, হইচই কিচ্ছু নেই। খাওয়াদাওয়া সেরে নিজেরাই গুটিগুটি বিছানার পানে হাঁটা লাগাই, একবার বাবাকে তলব করে। আমার মনে আছে, ঐ সাজিমাটি আর কুলপি বরফের জায়গাটায় আমরা এক্কেবারে হিজি বিজ বিজ-এর স্টাইলেই হেসে কুটপাটি হয়েছিলাম। পুজোর ছুটির শেষ হবার পর, দিদিয়া-ভাইয়ারা চলে যাওয়ার পরেও অনেকগুলো রবিবার বাবার গলায় পাগলা দাশু্র সব গল্প, হিংসুটে, অবাক জলপান, শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছি।
সুকুমার সমগ্র'টা পঁচিশ বছরের অত্যাচারে অনেকটাই জীর্ণ। এখন খুব সাবধানে নাড়াচাড়া করতে হয়। তবুও মাঝেসাঝেই নামিয়ে ফেলি তাক থেকে। তবে সেটা শুধুই সুকুমার রায়'এর মোহে নয়। তার কারণ এই একটাই মাত্র উপহারে বাবাকে আমি যে নামে ডাকি আর বাবা আমাকে যে নামে ডাকে, তার উল্লেখ আছে। বইটার প্রথম পাতায় বাবার হাতে লাল কালিতে লেখা একটা ছড়া-
"লক্ষীসোনা মারেম আমার
বয়স হলো ছয়
ভর্তি হলো ক্লাস ওয়ান এ
আর দেরী না সয়
মনটি দিয়ে লেখাপড়া
করতে হবে জেনো,
ভালোবাসবে সবাই তোমায়
কথা যদি শোনো।"
- বাম্পি
No comments:
Post a Comment